শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০২ অপরাহ্ন

ঝালকাঠিতে ১২০টি গাছ কাটার পর স্থগিত হলো প্রায় ২ হাজার গাছ কাটার প্রকল্প

ঝালকাঠিতে ১২০টি গাছ কাটার পর স্থগিত হলো প্রায় ২ হাজার গাছ কাটার প্রকল্প

ঝালকাঠিতে ১২০টি গাছ কাটার পর স্থগিত হলো প্রায় ২ হাজার গাছ কাটার প্রকল্প

ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান নদীর পাড়ে চার কিলোমিটার পুরাতন রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দুই হাজার গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছিল বন বিভাগ। দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে গত এক সপ্তাহে ইতোমধ্যে ১২০টি মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়। তবে পরিবেশকর্মীদের প্রতিবাদ এবং উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয় সামনে আসার পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে আপাতত গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিবাদে সামনে আসে বিষয়টি
প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরেন পরিবেশকর্মী ও স্টার নিউজের ঝালকাঠি প্রতিনিধি ইসমাঈল মুসাফির। পরে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে গাছ কাটা বন্ধের অনুরোধ জানান তিনি।
তার এই উদ্যোগে সহমত পোষণ করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি)-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ। তিনি উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয়টি ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিনকে অবহিত করেন। ওই রায়টি দিয়েছিলেন বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি আসিফ হাসান।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে গাছ কাটা এখনও চলছে- এমন তথ্য জেলা প্রশাসককে জানানো হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার কাজটি বন্ধ করে দেন।

নদী রক্ষা প্রকল্পের আড়ালে গাছ কাটার পরিকল্পনা

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাবখান নদীর পাড়ে ব্লক ফেলতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নদীর পাশে পাশাপাশি রয়েছে একটি নতুন এবং একটি পুরাতন রাস্তা।

গাবখান বাজার থেকে বারুহাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় পুরাতন রাস্তা থেকে নদীর পানির দিকে গড়ে ২০ ফুটেরও বেশি শুকনো পাড় রয়েছে। শীত মৌসুমে কোথাও কোথাও এই পাড়ের প্রস্থ দ্বিগুণ। আবার অনেক জায়গায় জিও ব্যাগ থেকে পাড় পর্যন্ত দূরত্ব ৫০ ফুটেরও বেশি।

স্থানীয়দের মতে, নদীর পাড়ে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও উঁচু পুরাতন রাস্তাটিতেও ব্লক ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রাস্তার দুই পাশে থাকা হাজার হাজার গাছ কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বন বিভাগের তথ্যমতে, প্রায় দেড় বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড গাছ কাটার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। কয়েক দফা বৈঠকের পর একটি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসক গাছ কাটার অনুমতি দেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪৭টি লটে মোট ১ হাজার ৮১৫টি গাছ কাটার জন্য চিহ্নিত করে বন বিভাগ। দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বন বিভাগের নথিতে দেখা যায়, প্রতিটি লটে গড়ে প্রায় ৪০টি করে গাছ রাখা হয়েছে। তবে বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাস্তবে একেকটি লটে ৫০টি করে গাছ কাটার পরিকল্পনা ছিল। সে হিসাবে মোট গাছের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে অন্তত ২ হাজার ৩৫০টি।

৪৭টি লটের মধ্যে ৩৭টি লটের ঠিকাদারি পান ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নজরুল মেম্বারসহ চারজন ঠিকাদার। বাকি ১০টি লট পান ঝালকাঠি সদর ও কাঠালিয়া উপজেলার তিনজন ঠিকাদার। মোট ১ হাজার ৮১৫টি গাছের বিপরীতে দরপত্রে মূল্য উঠেছিল প্রায় ৬০ লাখ টাকা।

বৈচিত্র্যময় বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল

বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, মোট গাছের মধ্যে মাত্র ৮০০টির বিশ্লেষণেই পাওয়া গেছে অন্তত ২৬ প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে রয়েছে- রাজ কড়াই, কাঞ্চন, তুলা, অর্জুন, শিশু, বাবলা, তেঁতুল, জারুল, কড়ই, জাম, নিম, কাঁঠাল, গামার, সেগুন ও আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।

পরিবেশকর্মী ও ঝালকাঠির সিনিয়র আইনজীবী নাসির উদ্দীন কবীর বলেন, “সংখ্যাটা দুই হাজারের বেশি হোক বা কম- এত গাছ কাটার চিন্তা একজন প্রকৌশলীর মাথায় কীভাবে আসে, সেটাই প্রশ্ন। এখানে সামাজিক বনায়নের পাশাপাশি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য রয়েছে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় অন্তত ১০০ প্রজাতির পাখি বাস করে। এছাড়া সরীসৃপের মধ্যে বিরল আকারের অসংখ্য গুইসাপও দেখা যায়।
তিনি বলেন, “এই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে কোনোভাবেই গাছ কাটতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে।”
এদিকে, গাছ কাটার কাজ শুরু হওয়ার পর তিনটি স্থানে ৩টি লটের মোট ১২০টি গাছ কেটে ফেলা হয়। এসব গাছের মধ্যে ছিল রাজ কড়ই, অর্জুন, শিশু, তুলা, নিম ও বাবলাসহ অন্তত ১৫ প্রজাতির গাছ।
ঝালকাঠি জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের নির্দেশ পাওয়ার পর গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি বলা ছাড়া কেউ একটি ডালও কাটতে পারবে না। গাছের প্রতি বন বিভাগের মায়াই সবচেয়ে বেশি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে বলার পর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা গাছ কাটার প্রক্রিয়ায় গিয়েছিলাম। ব্লক ফেললে গাছ এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ‘সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। গাছ কাটার সিদ্ধান্ত যখন হয়েছিল তখন সেই রায়টি ছিল না। এখন গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামনে বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ একটি কমিটির সুপারিশ ছাড়া এভাবে গাছ কাটা যাবে না।’
তার মতে, ‘পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে এমনভাবে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে টেকসই নয়।’

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন












All rights reserved@KathaliaBarta 2016-2026
Design By Rana