সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৫ পূর্বাহ্ন
আর একদিন পর পহেলা বৈশাখ। বঙ্গাব্দ ১৪৩৩। পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুনের আহ্বানে প্রস্তুত প্রশাসন থেকে শুরু করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে তাই রঙিন আয়োজনে প্রস্তুত প্রায় যশোরের ৪০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন।
উৎসবকে ফুটিয়ে তুলতে শোভাযাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছে বিশালাকার পাখি, হাতি, ঘোড়া, বর্ণিল মুখোশ ও রঙিন ফুল। নিয়মিত মহড়া চলছে নাচ, গান, কবিতা ও নাটকের।
পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ শোভাযাত্রা, যার সূচনা হয় চারুপীঠ থেকে। চলতি বছর ‘নিত্য নতুনের অমৃতধারা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। এবারের শোভাযাত্রায় হরেকরকম মুখোশের পাশাপাশি চারুপীঠের সদস্যরা তৈরি করেছেন বিশালাকার মোরগ, কবুতর, শিয়াল ইত্যাদি।
নতুন ভোরের বার্তাবাহক মোরগের ১৮ ফুট উচ্চতার বিশাল একটি প্রতিরূপ, যা ইতোমধ্যে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নতুন দিনের জাগরণের প্রতীক হিসেবেই ধরা হচ্ছে এটিকে।
চারুপীঠের অধ্যক্ষ ভাস্কর মাহবুব জামাল শামীম ও তার সহপাঠী হীরন্ময় চন্দের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে যশোরে নববর্ষের প্রথম শোভাযাত্রা বের হয়। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে যা সম্প্রসারিত হয়। সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়।
ভাস্কর মাহবুব জামাল শামীম বলেন, যখন প্রথম শুরু করি, তখনই বলেছিলাম বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন নাম রাখতে পারবে এই শোভাযাত্রার। শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য হলো, অঞ্চলে-অঞ্চলে সংস্কৃতির চর্চা। আমি একজন সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতিকর্মীরা বিবাদে জড়ায় না, তারা চায় বন্ধুত্ব। এ লক্ষ্য থেকে যেন আমরা বিচ্যুত না হই। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এটি একটি সার্বজনীন উৎসব।
জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবর্তন যশোর ও সুরধুনী এবারও যৌথভাবে বৈশাখ বরণের আয়োজন করছে। বর্ষবরণের দিন শহরের নবকিশলয় মাঠে অনুষ্ঠিত হবে প্রভাতী ও বৈকালি দুই পর্বের অনুষ্ঠান।
বিবর্তনের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল বলেন, অনুষ্ঠান শুধু আনন্দ দেবে তা নয়, একটি ইতিবাচক বার্তাও ছড়িয়ে দিক। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে শান্তির আহ্বানটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের আয়োজনের শুরুতেই আমরা সেই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।
সুরধুনী সংগীত নিকেতন যশোরের সভাপতি হারুন আর রশিদ বলেন, আমাদের এই যৌথ আয়োজন দীর্ঘদিনের। প্রতি বছরই আমরা চেষ্টা করি নতুন কিছু যোগ করতে। আমরা আশাবাদী একটি চমৎকার অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারব।
এসএম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজে তৈরি হচ্ছে বিশালাকার হাতি ও ঘোড়া। কাঠ, বাঁশ ও কাপড় দিয়ে এসব কাঠামো রঙের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত করে তোলা হচ্ছে। ১৪ ফুট উঁচু নান্দনিক হাতি ও ঘোড়ার অবয়ব দেখে যশোরবাসীর মধ্যে ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
হাতি ও ঘোড়া সাধারণত শক্তি ও সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অতীতে রাজা-জমিদারদের আমলে শোভাযাত্রার প্রধান অংশ ছিল এগুলো। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই আজও বড় উৎসব বা মিছিলে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে হাতি-ঘোড়া ব্যবহৃত হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. শামীম ইকবাল জানান, এসএম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজের এ প্রস্তুতি কেবল উৎসব পালন নয়, বরং অপশক্তির বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক শৈল্পিক লড়াই। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই কর্মযজ্ঞে হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার নিরন্তর প্রচেষ্টা ফুটে উঠেছে।
ব্যাপক আয়োজনে নতুন বছর বরণে যশোরের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। করোনার কারণে ১৪২৭ ও ১৪২৮ বঙ্গাব্দে মানুষ ঘরবন্দি ছিল। ১৪২৯ ও ১৪৩০ সালে রমজান মাস থাকায় সীমিত পরিসরে বর্ষবরণ করা হয়।
উদীচী, বিবর্তন, সুরধুনী, পুনশ্চ, তির্যক, সুরবিতানসহ জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নাচ, গান, নাটক ও গীতিনাট্যের মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে।
উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, যশোর পৌরপার্কে উদীচীর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের এবার ৫০ বছর পূর্তি। এ কারণে আমরা বেশি উজ্জীবিত। এবারও পৌর উদ্যানে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সকাল ও বিকালে দুই দফায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, যশোরের ৪০টির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রায় এক হাজার কর্মী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবার টাউন হল ময়দান থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা বের হবে।
তবে এবারের বর্ষবরণে থাকছে কিছু ভিন্নতা ও কড়াকড়ি নির্দেশনা। মুখোশ পরা যাবে না এবং সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে সন্ধ্যার আগেই- এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার জানিয়েছেন, যানজট নিরসন ও জননিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবারও বর্ণিল আয়োজনে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপিত হবে। প্রতিকৃতি বা প্ল্যাকার্ড হিসেবে মুখোশ ব্যবহার করা যাবে। সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে সন্ধ্যার আগেই।