মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:১৪ অপরাহ্ন

সম্প্রীতির আনন্দভ্রমন : কাঠালিয়ার ছৈলার চরে পিপিজির সদস্যদের একদিন

সম্প্রীতির আনন্দভ্রমন : কাঠালিয়ার ছৈলার চরে পিপিজির সদস্যদের একদিন

ফারুক হোসেন খান:

২০১৯ সনের ২৫ ডিসেম্বর বরিশালের পুলিশ লাইস সংলগ্ন সেলিব্রশন পয়েন্ট মিলনায়তনে সচেতন সংগঠিত  ও সোচ্চার জনগোষ্টিই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ পিস প্রেসার গ্রুপ (পিপিজি) সদস্য অংশ গ্রহনে সম্প্রীতির মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয় । দি-হাঙ্গার প্রজেক্ট বরিশালের উদ্যোগে কাঠালিয়া, নলছিটি, ঝালকাঠি সদর, বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়ার  পিপিজির সদস্যরা এ মিলন মেলায় অংশ নেয়। দিনব্যাপি মিলন মেলায় গল্প আড্ডা, নাচ গান কৌতুকসহ সকালের নাস্তা দুপুরের খাবারসহ সবকিছুই ছিল মেলায়।
অধ্যক্ষ জাহিদ হাসানের সভাপতিত্বে ঝালকাঠি জেলা সুজন সভাপতি ইলিয়াস সিকদার ফরহাদের সঞ্চলায় বক্তব্য রাখেন দি-হাঙ্গার প্রজেক্ট বরিশালের আঞ্চলিক সমন্বয়কারি মেহের আফরোজ মিতা, ঝালকাঠির মইন তালুকদার, মো.জসিম উদ্দিন সরদার. খালেদা ওয়াহাব ফারুক হোসেন খান, তাজুল ইসলাম তালুকদার ও প্রবীন সাংবাদিক হেমায়েত উদ্দিন হিমু।

পিপিজি কাঠালিয়া উপজেলা শাখার কো-অডিনেটর ও সুজন সম্পাদক সাংবাদিক ফারুক হোসেন খান তার বক্তব্যে ৫ উপজেলার পিপিজির সকল সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গকে উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির দক্ষিণ জনপদ কাঁঠালিয়ার বিষখালী নদীর তীরে প্রকৃতির নৈসর্গ ছৈলার চর ভ্রমনে আমন্ত্রণ জানান। সভায় সবাই হাত উচিয়ে সমর্থন জানান। ওই বৈঠকেই ১৮ জানুয়ারী’ শনিবার ২০২০ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। নিধার্রিত তারিখে সকাল ৯টা থেকে বাস মাইক্রোসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে কাঠালিয়ায় পৌছায় পিপিজির সদস্যরা। বেলা ১১টায় পিপিজির সদস্যসহ শতাধিক ভ্রমন পিপাসুদের নিয়ে দুটি ট্রলারে ছৈলারচরে যাত্রা শুরু করে। বিষখালী নদীর মাথাল ঢেউয়ের তালে তালে হেলে দুলে নদীর দুই ধারের অপরুপ দৃশ্য দেখতে দেখতে বেলা সারে ১১টায়  পিপিজির সদস্যদের বহনকারি ট্রলার ২টি স্বপ্নের ছৈলার চরে পৌছায়। চরের কাদা মারিয়ে চরের মধ্যে ঢুকতেই আনন্দে সকলে আতœহারা হয়ে পড়ে। অপরুপ দৃশ্য দেখে সকলের মন ভরে যায়। যে যার মত শুরু করে ছৈলা বনের মধ্যে ছুটাছুটি শুরু করে। সবাই গানের শুরে আজ কোথাও যেন হারিয়ে যেতে নাই মানা। সবাই স্বাধীন কোন বাধা নিষেধ নেই। ছোট-বড় সবাই যেন আনন্দে আতœহারা। যেদিকে তাকাই শুধু সবুজ আর সবুজ ছৈলার গাছের বন। মনে হয় যেন এখন আমরা সুন্দরবনে আছি। চতুদিকে নদী। মাঝখানে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দয্যের লীলাভুমি ছৈলারচর। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় আনন্দভ্রমনের কার্যক্রম। পরিচয় পর্বের পর ঝালকাঠি সুজনের পক্ষ থেকে আগৈলঝাড়া, বাবুগঞ্জ, নলছিটি, ঝালকাঠি ও কাঠালিয়ার পিপিজির সদস্যদের ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করা হয়। ইতিমধ্যে বাবুর্চিরা রান্না শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎ মাইকে ভেসে এলো ঝালকাঠির কাউন্সিল নাসিমা কামালের গন্ঠে সুমধুর গান। শুধু নাসিমা কামাল নয় গান পরিবেশন করেন নলছিটি উপজেলার সাবেক নারী ভাইস চেয়ারম্যান ডালিয়া নার্গিসসহ পিপিজির সদস্যরা। হঠাৎ স্পীডবোর্ডের শব্দ বোর্ড থামতে চরে নেমে এলো বরগুনার বেতাগী থানার অফিসার ইনচার্জ চৌকস পুলিশ অফিসার মো, কামরুজ্জামান মিয়া সাথে থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম, বেতাগী প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাপ্তাহিক বিষখালী পত্রিকার সম্পাদক আবদুল সালাম সিদ্দিকী, সাংবাদিক মহসিন খান।

দলে দলে ছৈলার চরের মধ্যে ঢুকে ছবি তোলাসহ ছৈলা ফল ও ফুল তোলার হিড়িক। নাস্তার সাথে ছিল খেজুরের কাচা রস। ছিল খেলাধুলা হাড়িভাঙ্গা (পুরুষ-মহিলা)  হাড়ি লুকানো, মহিলাদের দৌড় প্রতিযোগীতা। সবচেয়ে মজার ছিল হাড়ি ভাঙ্গার সময় চোখ শক্ত করে চোঁখ বাধায় কাউন্সিলর নাসিমা কামাল বাঁশ নিয়ে সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জালাল আকনকে ধাওয়া করা। দি-হাঙ্গার প্রজেক্টের ফিল্ড অফিসার মোজাম্মেল হক কমপক্ষে ২০ বার পা ফেলে হাড়ির স্থান চি‎িহ্নত করে চোখ বাধায় অবস্থায় হাড়ি ভেঙ্গে প্রথম পুরস্কার পান। মহিলাদের হাড়ি ভাঙ্গায় কাঠালিয়া পিপিজির সদস্য প্রেস ক্লাবের মহিলা সদস্য ইসরাত জাহান রুমা হাড়ি ভেঙ্গে সে প্রথম পুরস্কার গ্রহন করেন। নারীদের দৌড়ে সাদিয়া রহমান প্রথম হন। খেলাধুলা শেষে হাতে হাতে ঝালমুড়ি। তিনটায় দুপুরের খাবার সম্প্রীতির মিলন মেলায় মাঠে বিছানা বিছিয়ে শুরু হয় সবজী, বিষখালী নদীর ইলিশ জাল মুরগী ও ডাল। সাথে ছিল ফিরনি ও মিস্টি। খাবার পরে আগৈলঝাড়ার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন সরদারের চমৎকার উপস্থাপনায় র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ পুরস্কার বিতরণ করার পরই সুর্য পশ্চিম আকাশে নিচে চলে যায়। শুরু হয় পাখির মত নীড়ে ফেরার পালা। সবার হাতে ছৈলা ফল ও ফুল। সন্ধ্যা নামার আগেই একটি ট্রলার কাঠালিয়ায় পৌছে যায়। অপর ট্রলারটি সন্ধ্যার পরে কাঠালিয়া সদরে থামে। সব মিলিয়ে ছৈলার চরে একদিন। বিষন বিষন ভাল লাগছিল। ছৈলার চরের দৃশ্য ভোলার মত নয়। মন চায় বলতে চলো যাই ছৈলারবন’হারিয়ে যাই কিছুক্ষন। ছৈলার চরে গিয়ে মনে হয়েছে।
পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও রয়েছে নানা সংকট। তবু সেই সংকট উপেক্ষা করেই প্রকৃতির নয়নাভিরাম এই ছৈলার চর পর্যাটকের মিলন মেলায় পরিনত হচ্ছে। পৃষ্টপোষকতা পেলে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বিষখালীর বুক চিরে জেগে ওঠা ছৈলার চর।
জানা যায়, বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার নিকটবর্তী কাঁঠালিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের হেতালবুনিয়া মৌজায় বিষখালী নদীতে এক যুগেরও আগে ৭০ একর জমি নিয়ে জেগে উঠেছে এক বিশাল চর। যেখানে রয়েছে লক্ষাধিক ছৈলা গাছ। আর ছৈলা গাছের নাম থেকেই জেগে ওঠা এ চরের নামকরণ করা হয়েছে ‘ছৈলার চর’। শীতের সময় শুকনো চরে গহীন অরণ্য। চারপাশে নদী ঘেরা যেন ছৈলার বনের দ্বীপ। আর সেখানে লাখ ছৈলা গাছে পাখিরা বেঁধেছে নীড়। শালিক, ডাহুক আর বকের সারি। ছৈলা ছাড়াও এখানে কেয়া, হোগল, রানা, এলি, মাদার, আরগুজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে ঘেরা। তাই পাখির কিচিরমিচির ডাক সব সময়। ভ্রমন পীপাষুদের প্রতিদিনের পদচারণায় এখন মুখরীত ছৈলার চর। ২০১৫ সালে ছৈলারচর স্থানটি পর্যটন স্পট হিসেবে চি‎হ্নিত করা হয়েছে। কাঁঠালিয়া লঞ্চঘাট থেকে নৌপথে যেতে হয় ছৈলার চরে। আমুয়া বন্দর থেকেও ট্রলারে কিংবা অন্য যেকোন নৌযানে যাওয়া যায়। সড়ক পথে হেতালবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার সামনে কেল্লা পর্যন্ত যাওয়া যায়। পর্যটন এলাকাকে ঘিরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রেষ্ট হাউজ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ থেকে এখানে ঘাটলা, গভীর নলকুপ, বাথরুম এবং একটি সেট তৈরী করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ছৈলার চরে পর্যটকদের সুবিধার্থে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ছৈলার চরটি পর্যাটন সম্ভাবনার হাতছনি, এখানে পর্যাটকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা তৈরি করতে ইতোমধ্যেই পর্যাটন মন্ত্রনালয়ে চিঠি দিয়ে আবেদন জানানো হয়েছে।
ছৈলার চরে ঘুরতে আসা দর্শানার্থী মো.আমিনুল ইসলাম জমাদার জানান,অনেক দৃষ্টি নন্দন এই ছইলারচর। প্রকৃতিকভাবে এখানে ছইলার বনের সৃষ্টি যা বিষখালী নদীর তীরবর্তী অপুর্ব নৈসগিক। এখানে পর্যটনের অপার সম্ভবনা আছে। সরকারিভাবে যদি এখানে পিকনিক স্পট গড়ে তোলা যায় তাহলে সরকার এখান থেকে রাজস্ব খাতে আয় সম্ভব।
কাঠালিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো.রবিউল ইসলাম কবির সিকদার বলেন, প্রকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা ছইলার বনভুমি প্রকৃতির অপার সম্ভবনাময়। এখানে প্রচুর মানুষজন ঘুরতে আসে। পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। এখানে পর্যটনের সম্ভবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোন ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। এখানে শীত মৌসূমে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পিকনিক করতে আসে। অবকাঠামোগত কিছু না থাকায় সরকার রাজস্ব পাচ্ছেনা। এটি যদি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় তবে সরকারে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।
এ ব্যাপারে কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আকন্দ মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দীন বলেন, ছৈলার চরকে নিয়ে প্রশাসনের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। যার কারণে ছৈলারচরকে পর্যটন কেন্দ্র করার বিষয়ে পর্যটন কর্পোরেশনকে লেখা হয়েছে।

 

Share Button
Print Friendly, PDF & Email





পুরাতন খবর

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © 2020
Design By Rana